পৃথিবীর মানচিত্রে তারা ছড়িয়ে আছে। কেউ আটলান্টিকের ওপারে, কেউ প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপে। কেউ এশিয়ার জনসমুদ্রে, কেউ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, ইতিহাসও এক নয়। এমনকি অতীতের স্মৃতিও সবার জন্য সমান নয়।
চার বছর পরপর তারা একটি মাঠে এসে দাঁড়ায়। কেউ ইংল্যান্ড, কেউ ভারত, কেউ অস্ট্রেলিয়া, কেউ বাংলাদেশ। কেউ আবার এমন একটি ছোট্ট দ্বীপদেশ, যার নামও পৃথিবীর অনেক মানুষের অজানা। স্টার্টিং লাইনে দাঁড়ানোর পর বড় ছোট বলে কিছু থাকে না। তখন পরিচয় একটাই অ্যাথলেট।
এই গল্পের নাম কমনওয়েলথ গেমস। আলোঝলমলে এই আসরের শুরুটা ছিল খুবই ছোট। ১৯৩০ সালে কানাডার হ্যামিল্টনে প্রথম আসরের নাম ছিল ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস। অংশ নিয়েছিল মাত্র ১১টি দেশ, প্রায় ৪০০ অ্যাথলেট। ছয়টি খেলায় ছিল ৫৯টি ইভেন্ট। নারী অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ ছিল শুধু সাঁতারে। থাকার ব্যবস্থাও আজকের মতো বিলাসবহুল ছিল না। একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষেই অনেক অ্যাথলেট একসঙ্গে রাত কাটিয়েছিলেন। সেই ছোট্ট আয়োজনের বুকেই জন্ম নিয়েছিল এক বিশাল স্বপ্ন।
সেই স্বপ্নের অন্যতম কারিগর ছিলেন কানাডার মেলভিল মার্কস ‘ববি’ রবিনসন। ১৯২৮ সালের আমস্টারডাম অলিম্পিকে তিনি কানাডা দলের ম্যানেজারের পাশাপাশি সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তার ভাবনা ছিল, অলিম্পিকের মতো একটি ক্রীড়া আসর হবে, কিন্তু তার চরিত্র হবে কিছুটা আলাদা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, শত্রুতা নয়। জয়ের আকাঙ্ক্ষা থাকবে, বন্ধুত্ব হারিয়ে নয়। সেই দর্শন থেকেই একসময় গেমসটির পরিচিতি হয়েছিল ‘ফ্রেন্ডলি গেমস’ নামে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে পৃথিবী, বদলেছে সাম্রাজ্যের মানচিত্র, স্বাধীন হয়েছে একের পর এক দেশ। সেই পরিবর্তনের সঙ্গেই বদলেছে গেমসের নামও। ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস থেকে ব্রিটিশ এম্পায়ার অ্যান্ড কমনওয়েলথ গেমস, পরে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ গেমস। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৮ সাল থেকে এর পরিচয় কমনওয়েলথ গেমস।
এই ইতিহাস শুধু পদক আর রেকর্ডের নয়। এর শরীরে রাজনীতির ক্ষতও আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে কমনওয়েলথের অবস্থান একসময় ক্রীড়াঙ্গনেও বড় প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭৭ সালের গ্লেনিগলস চুক্তিতে সদস্য দেশগুলো বর্ণবৈষম্যের ভিত্তিতে পরিচালিত দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়াব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক নিরুৎসাহিত করার অঙ্গীকার করে। ১৯৮৬ সালের এডিনবরা গেমস সেই রাজনৈতিক উত্তাপের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপে অনীহার প্রতিবাদে ৩২টি দেশ গেমস বর্জন করে। শেষ পর্যন্ত অংশ নেয় মাত্র ২৬টি দেশ। সেদিন খেলার মাঠ হয়ে উঠেছিল ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে পৃথিবীর বিবেকের আরেকটি মঞ্চ।
তারপরও গেমস থেমে থাকেনি। কখনো লন্ডন, কখনো সিডনি, কখনো অকল্যান্ড। কখনো কার্ডিফ, কিংস্টন, এডমন্টন। কখনো দিল্লি, গোল্ড কোস্ট, বার্মিংহাম। শহর বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে। চার বছর পরপর কোনো এক স্টেডিয়ামের টানেলে আবার শোনা গেছে অ্যাথলেটদের পায়ের শব্দ। এই গেমস জন্ম দিয়েছে অসংখ্য অবিস্মরণীয় মুহূর্তের। ১৯৫৪ সালের ভ্যাঙ্কুভারে রজার ব্যানিস্টার ও জন ল্যান্ডির কিংবদন্তি ‘মিরাকল মাইল’ আজও অ্যাথলেটিকস ইতিহাসের অমর অধ্যায়। এমন অসংখ্য গল্পই কমনওয়েলথ গেমসকে মানুষের স্মৃতিরও অংশ করে রেখেছে।
স্কটল্যান্ডের সঙ্গে এই গেমসের সম্পর্ক আরও গভীর। ১৯৭০ সালে এডিনবরায় প্রথমবার গেমসে মেট্রিক দূরত্ব এবং ইলেকট্রনিক ফটো-ফিনিশ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ১৯৮৬ সালে আবারও আয়োজক হয় এডিনবরা। এরপর ২০১৪ সালে গ্লাসগো। ৭১টি দেশ ও অঞ্চলের ৪ হাজার ৯২৯ অ্যাথলেটের অংশগ্রহণে ১১ দিনের সেই উৎসব শহরটিকে কমনওয়েলথের রাজধানীতে পরিণত করেছিল। এবার আবার গ্লাসগো। ২০২৬। একই শহর, কিন্তু পৃথিবী আর আগের পৃথিবী নয়।
খেলাধুলার একটি নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষায় ছোট দেশ বলে কিছু নেই। একটি দ্বীপদেশের অ্যাথলেটও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের পাশে একই স্টার্টিং লাইনে দাঁড়ান। একজন প্যারা অ্যাথলেটও একই গেমসের অংশ, একই সম্মানের দাবার। সময়ের সঙ্গে কমনওয়েলথ গেমস প্যারা স্পোর্টকে নিজের মূল কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছে। অন্তর্ভুক্তির এই দর্শনই আধুনিক কমনওয়েলথ গেমসের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়গুলোর একটি। যে গেমসে একসময় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল শুধু সাঁতারে, সেই গেমস আজ নারী-পুরুষের সমতা এবং প্যারা অ্যাথলেটদের সমঅধিকারকে সামনে নিয়ে এগিয়ে চলেছে।
১৯৩০ সালের হ্যামিল্টনের ৪০০ অ্যাথলেটের ছোট্ট আয়োজন থেকে ২০২৬ সালের গ্লাসগো প্রায় এক শতাব্দীর যাত্রা। এই পথে সাম্রাজ্য ছিল, স্বাধীনতা এসেছে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। বয়কট হয়েছে। শহর কেঁদেছে, শহর উদ্যাপন করেছে। কেউ বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন, কেউ এক সেকেন্ডের জন্য পদক হারিয়েছেন। কারও গলায় উঠেছে স্বর্ণপদক, কেউ খালি হাতে দেশে ফিরেও হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা।
পদকগুলো থেকে যায় জাদুঘরে। রেকর্ড একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু কিছু দৃশ্য থেকে যায় মানুষের মনে। পতাকা হাতে স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়া একটি ছোট দেশের দল। গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকা মা-বাবা। জীবনের শেষ দৌড়ে নামা এক প্রবীণ অ্যাথলেট। প্রথম আন্তর্জাতিক আসরে এসে বিস্ময়ে চারদিকে তাকানো এক তরুণ। প্যারা অ্যাথলেটের গলায় পদক পরার মুহূর্তে চোখের জল। এই দৃশ্যগুলোর কোনো বিশ্বরেকর্ড নেই। এগুলোই গেমসের সবচেয়ে বড় অর্জন।
২৩ জুলাই গ্লাসগোয় আবার আলো জ্বলবে। পতাকা উড়বে। ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের মানুষ নিজেদের গল্প নিয়ে একটি শহরে মিলিত হবে। কেউ আসবে জিততে, কেউ নিজের সেরাটা ছুঁতে।
হ্যামিল্টন থেকে গ্লাসগো। ১৯৩০ থেকে ২০২৬। প্রায় এক শতাব্দী ধরে ব্যাটনটি হাতবদল হতে হতে এগিয়ে চলেছে। পৃথিবী বহুবার বদলেছে, তবু মানুষ এখনো মাঠে আসে। এখনো একটি ফিনিশিং লাইনের সামনে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে। এখনো অপরিচিত দেশের একজন অ্যাথলেটের জয় দেখে অন্য দেশের মানুষ হাততালি দেয়। তাই কমনওয়েলথ গেমস ১০০ মিটারের দৌড়, স্বর্ণপদকের লড়াই ছাপিয়ে বহু দেশের, বহু ইতিহাসের, বহু স্বপ্নের একই মাঠে এসে দাঁড়ানোর গল্প। একটি পতাকার নিচে নয় একই আকাশের নিচে।
লেখক: বাংলাদেশি ক্রীড়া সাংবাদিক, কলামিস্ট
মুক্তচিন্তা থেকে আরো পড়ুন