ভূ-বিজ্ঞানের ইতিহাসের পুরানো অধ্যায়কে উসকে দিয়ে সমুদ্রতলের প্রচন্ড ভূমিকম্পে সমুদ্রের পানিকে ঠেলে তুলে দিয়ে তৈরি করেছে ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাস বা সুনামি। ইন্দোনেশিয়ায় সুমাত্রা উপকূলের কাছে ভারত মহাসাগরের ৪০ কিলোমিটার নীচে কেন্দ্রীভূত ৮.৯ রিখটার স্কেলের ভূকম্পনটাই গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছ'টি উপকূলবর্তী দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। যার রেশ এখনও মাঝেমধ্যে টের পাচ্ছেন উপকূলবর্তী মানুষরা।
সমুদ্রের তলদেশে প্রচন্ড ভূকম্পন ভারতকে প্রথম সুনামির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে সুনামি হয় না-এ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সুনামি নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য হয়নি এবং সুনামির জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস দেওয়ার কোনও পরিকাঠামো তৈরি করেনি। ভূমিকম্প একেবারে উচ্ছেদ না হোক, আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মত ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি সম্ভবা?
প্রশ্নটি নিয়ে এ মুহূর্তে পৃথিবীর ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। তবে সুনামির পূর্বাভাস নিয়ে আবাহরিজ্ঞান বেশ কিছু এগিয়ে গেছে। ১৯৪৯ সালে হনলুলুর ওহায়োতে তৈরি হয়েছে প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সিস্টেম বা পি ডব্লু টি সি। তারপর ইউনেস্কোর ইন্টারগর্তনমেন্টাল ওসেনোগ্রাফিক কমিশনের সৌজন্যে তৈরি হয়েছে 'ইন্টারন্যাশনাল সুনামি ইনফরমেশন সেন্টার'। ১৯৯৫ সাল থেকে সর্বাধুনিক সেন্সর ব্যবস্থা বা ডার্ট অথবা ডিপ ওসান অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড রিপোর্টিং-এর মাধ্যমে সিয়াটেলের প্যাসিফিক মেরিন এনভায়রনমেন্টাল ল্যাবরেটরিতে 'বটম প্রেসার রেকর্ডার' দ্বারা সুনামি সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য অনেক আগেই জানা এবং সুনামির ভয়াবহতারও আগাম বিশ্লেষণ যথেষ্ট নিপুণভাবে করা যাচ্ছে। জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বটম প্রেসার রেকর্ডার দ্বারা সারা পৃথিবীতে যথেষ্ট সময় থাকতেই পৌছে যায়।
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের যন্ত্রপাতি ছাড়াও জীবজগতের কিছু কিছু পরিবর্তন ভূমিকম্পের আভাস দিয়ে থাকে। এর মধ্যে আছে মাগুর ধরনের মাছ বা ক্যাট ফিশ।
এছাড়া ব্যাঙ ও সাপ মাটির তলার গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে। আকাশে আচমকা রামধনু ফুটে ওঠে, চুম্বকের চৌম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যায়, কিংবা কুয়োর পানি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। ভূমিকম্পের আগে ক্যাট ফিশ চঞ্চল হয়ে ওঠার ব্যাপারটি নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালান বিখ্যাত জাপানি ভূপদার্থবিদ টেরাদা। ওর সমীক্ষায় প্রমানিত হয়, এ দুটি ব্যাপারের মধ্যে সত্যিই একটি বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক রয়েছে।
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার কাজে সবচেয়ে প্রথমে যে চীনা বিজ্ঞানী বেশ কিছুটা কাজ করেছেন, তাঁর নাম জান হেন। আসন্ন ভূমিকম্পের কেন্দ্র নির্ণয় করবার জন্য তিনি একটি যন্ত্র তৈরি করেন। এজন্য বিশেষ ধরনের একটা বড় পাত্রের ভিতরে তিনি লাগান একটা ঝুলন্ত পেন্ডুলাম। সে পেন্ডুলামের সঙ্গে আটটি কপিকল কোণাকুণি জোড়া থাকতে হবে। প্রত্যেকটি কপিকলের বাইরের দিকে শেষ প্রান্তে লাগানো একটা ড্রাগন। প্রত্যেকটি ড্রাগনের হাঁ করা মুখে একটা বল আটকানো। ভূমিকম্পের সময় কপিকলে টান পড়লে ড্রাগনের মুখ খুলে বল পড়ে যায় নীচে। ড্রাগনের মুখ থেকে বল পড়লেই বুঝতে হবে ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। এ যন্ত্রের সাহায্যে বহু দূরের ভূমিকম্পও অনুধাবন করা যেত।
ভূমিকম্পের প্রকৃতি ভালভাবে সমীক্ষা করে সোভিয়েত ভূ-বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে এসেছেন, ভূমিকম্পের আগে ভূপৃষ্ঠে ভূকম্প তরঙ্গের গতিবেগের একটি বিশেষ অনুপাত প্রচন্ডভাবে কমে যায়। ভূমিকম্পের কিছু আগে ভূগর্ভস্থ পানির রাসায়নিক চরিত্র অনেকটাই বদলে যায়। এ জাতীয় নানা পন্থা ও পদ্ধতির সাহায্যে সোভিয়েত ভুবিজ্ঞানীরা ১৯৬৬ সালের ২৬ এপ্রিল তাশখব্দ ভূমিকম্প সম্পর্কে পূর্বাভাস নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। একইভাবে মার্কিন ভূবিজ্ঞানীরাও ১৯৭৩ সালের ক্যালিফোর্নিয়ার ভূমিকম্প সম্পর্কে সফলভাবে পূর্বাভাস দিতে পেরেছিলেন।
ভূমিকম্পের ঠিক আগেই খবর পেয়ে যায় জীবজগতের ছোট ছোট প্রাণীরা। ১৮৯১ সালে জাপানের নোবি শহরের ভূমিকম্প সম্পর্কে এ ধরনের একটি সত্য ঘটনার কথা জানা যায়। এ শহরের একটি রেস্তোরাঁয় ছিল। অনেকগুলো পোষা ইদুর। আশ্চর্যের ব্যাপার, ভূমিকম্পের ঠিক আগের দিন ইঁদুরগুলো কোথায় যেন পালিয়ে গেল।
একই কারণে নাকি ১৮৫৫ সালে জাপানের ইডোয় ভূমিকম্পের প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে থেকে মুরগিগুলোকে কিছুতেই খাঁচায় ডোকানো যাচ্ছিল না।
ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের অর্থ হল কোথায়, কখন, কতটা তীব্রভাবে ভূমিকম্প হতে পারে, তা আগেভাগে বলতে পারা। এখনও পর্যন্ত কোথায়, কতটা তীব্র ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তা হয়ত মোটামুটিভাতে বলতে পারা সম্ভব। কিন্তু কবে? কখন হবে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর নিয়ে ভূবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে। যন্ত্র দিয়ে ভূমির এ হেলে পড়ার পরিমাণ ভূমিকম্প পূর্বাভাস কেন্দ্রে পাঠালে তা বিশ্লেষণ করে হয়ত আনুমানিকভাবে দিনক্ষণ আগাম বলে দেওয়া সম্ভব। তবু এখন পর্যন্ত যন্ত্রপাতির অভাব এবং তথ্য বিশ্লেষণে সঠিক পদ্ধতি আবিষ্কার না হওয়ায় ভূমিকম্প সম্পর্কে নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া যাচ্ছে না। তবে সুনামির পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ভূমিকম্পের আগে জীবজগতের যে পরিবর্তন দেখা যায়, সে পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া প্রয়োজনীয় যন্ত্র উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে চীন অনেকটাই এগিয়ে দেছে।
সাংবাদিক ও কলামিষ্ট। বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার (১ম স্বর্ণপদক) প্রাপ্ত। ০৩.১১.২০২৫
মুক্তচিন্তা থেকে আরো পড়ুন