বিশেষ প্রতিবেদন

প্রচারণার কৌশল পরিবর্তন

সিলেটে নিরব নির্বাচনী মাঠ

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ ১৫:১০

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই আলোচনায় আসছে এক অস্বাভাবিক দৃশ্যপট জমে উঠছে না নির্বাচনী আমেজ। সাধারণত ভোটের আগে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত পোস্টার, ব্যানার, মিছিল-মিটিংয়ে সরগরম হয়ে ওঠে এলাকা। কিন্তু এবার সিলেটের রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান কিংবা জনসমাগমস্থলে সেই প্রাণচাঞ্চল্য চোখে পড়ছে না। নির্বাচনী মাঠে যেন বিরাজ করছে নিস্তবতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরও নির্বাচন না হওয়ার শঙ্কা রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা এই শীতলতার মূল কারণ। একারনে নির্বাচন নিয়ে উচ্ছাস নেই বলে অনেকের ধারণা। আবার অনেকেই মনে করছেন প্রতীক বরাদ্দের পরপরই নির্বাচনী আমেজ তৈরী হবে। 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। কিন্তু এখনও সিলেটে নির্বাচনী সেই আমেজ নেই। এ অবস্থায় সিলেটের সাধারণ ভোটাররা নির্বাচন নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন। তবে ২২ জানুয়ারির পর প্রতীক বরাদ্দ হলে ভোটারদের মনের এ সংশয় কাটবে বলে আশা করছে নির্বাচন কমিশন। এবার সিলেটের সকল রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের এক মঞ্চে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ওইদিন সকল দলের প্রার্থীদের ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।


নির্বাচন কমিশন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণ বিধিমালা ২০২৫’ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আচরণবিধিতে প্রথমবারের মত নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে। এক মঞ্চে প্রার্থীদের ইশতেহার ঘোষণাসহ আচরণবিধি মানতে দল ও প্রার্থীর অঙ্গীকারনামা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।
আচরণবিধি ভাঙলে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিধান লঙ্ঘনে আরপিওতে প্রার্থিতা বাতিলেরও বিধান রয়েছে।
ভোটের প্রচারে ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না। আচরণবিধিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বিদেশে প্রচারণাতেও। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবে না।


সরেজমিনে দেখা গেছে, এবার সিলেটের কোথাও প্রার্থীরা নির্বাচনী কোনো পোস্টার ফ্যাস্টুন টানান নি। নতুন আচরণবিধিতে পোস্টার, ফ্যাস্টুন লাগানো নিষিদ্ধ। পরিবেশ বান্ধব চিন্তা থেকে এ পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন। এতে ভোটের মাঠ অনেকটাই ফাঁকা লাগছে। 
নগরী ঘুরে দেখা গেছে, এবার জিন্দাবাজারের মুক্তিযোদ্ধা গলির প্রেস, রাজা ম্যানশন, বন্দরবাজার ও সুরমা মার্কেটের প্রেসের দোকানগুলোতে তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। এবার পোস্টার ছাপাতে এসব প্রেসে কোনো অর্ডার নেই। অনেকটা অলস সময় কাটাচ্ছেন এসব প্রেস ব্যবসায়ীরা। 

ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রার্থীরা লিফলেট নিয়ে তাদের কাছে আসছেন। ১২ তারিখের নির্বাচনের দাওয়াত দিচ্ছেন প্রার্থীরা। কিন্তু চারপাশে ভোটের আমেজ তারা এখনও বুঝতে পারছেন না। কারণ, চারপাশে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা একটু কম। আগের মতো মাইকের শব্দ নেই, সড়কের উপরে রশিতে ঝুলেনি পোস্টার। 


নগরীর জিন্দাবাজারের চা বিক্রেতা খালেদ মিয়া জানান, তিনি সব সময় ওই এলাকায় চা বিক্রি করেন। কিন্তু যারা চা পান করতে আসে তারা নির্বাচন নিয়ে নানা শঙ্কার কথা বলে। তবে বিএনপি সহ বিভিণ্ন দলের লোকজন যখন আসে তাদের মুখে নির্বাচনের কথা শোনা যায়। তারাও অনেক সময় নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে। তবে তনি আশাবাদী যথাসময়ে নির্বাচন হবে। 


নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবার পরিবেশের কথা চিন্তা করে নির্বাচনী প্রচারণায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে পোস্টারে-পোস্টারে ছেয়ে যেত রাস্তা-বাজার। এখন প্রতীক বরাদ্দের আগে প্রার্থীরা পোস্টার লাগাতে পারবেন না, মাইক বাজাতে পারবেন না। তাই নির্বাচনে প্রচারণা কম। তবে এতে পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনের এত আগে ব্যয়বহুল প্রচারণার খরচ কমে এসেছে। পুরো বিষয়টি প্রার্থী ও পরিবেশের লাভ হয়েছে। যদিও প্রচারণায় খানিকটা ভাটা পড়েছে। 

সিলেট বিভাগীয় নির্বাচন অফিস জানায়, আগামী ২২ জানুয়ারির পর থেকে সিলেটে নির্বাচনী আমেজ আসবে। ওই সময়ে মাইকে প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে। প্রতীক পাওয়ার পর প্রার্থীরা ভোটারদের দরজায় কড়া নাড়লে নির্বাচনী আমেজ ফিরে আসবে বলে জানিয়েছে কমিশন। ফেব্রুয়ারির আসার আগেই সিলেটে সকল প্রার্থীদের নিয়ে একটি ইশতেহার অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে কমিশন। ওই ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে সকল দলের বাছাইকৃত প্রার্থী, ভোটার ও সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানে ভোটাররা তাদের প্রার্থীদের সরাসরি ইশতেহার নিয়ে প্রশ্ন করবেন, প্রার্থীরা প্রশ্নের উত্তর দিবেন। 

নগরীর লামাবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সজিব আহমদ বলেন,‘ ভাই , আগে বলেন, নির্বাচন কি হবে ? এখনও তো তেমন কোনো নড়াচড়া দেখি না। চারপাশ তো খালি খালি দেখি। নির্বাচনের কোনো আলামত তো এখনও নেই।’

নগরীর বন্দরবাজারের প্রিন্ট পয়েন্ট-এর স্বত্ত্বাধিকারী নোমান বিন আরমান বলেন,‘ দেশের নির্বাচনের পুরনো একটি সংস্কৃতি ছিল পোস্টার। কিন্তু পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিয়ে এবার পোস্টার নিষিদ্ধ করেছে কমিশন। তাই প্রেসে পোস্টার নিয়ে কোনো ব্যস্ততা নেই। এ যেন পোশাক ছাড়া ঈদের মতো, পোস্টার ছাড়া নির্বাচন।’ 
হবিগঞ্জ-১ আসনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী কাজী তোফায়েল আহমদ বলেন,‘ পোস্টার নির্বাচনের উৎসবের একটি অংশ। এটি নিষিদ্ধ করে পরিবেশের কিছুটা লাভ হয়েছে, কিন্তু নির্বাচনী উৎসবে ভাটা পড়েছে। তাছাড়া ২২ তারিখের পর তিন সপ্তাহ সময় প্রচারণার জন্য খুব একটা পর্যাপ্ত সময় নয়। কমিশন ইশতেহার অনুষ্ঠান করবে সিলেটে, সেখানে তো আমার ভোটার যাবে না। এটা তেমন ফলপ্রসূ হবে না।’


এ ব্যপারে সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন বলেন,‘ এটা ঠিক পোস্টার না থাকায় প্রচারণাটা একটু কম হচ্ছে। এটা পরিবেশ ও প্রার্থীদের খরচ কমানোর চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২২ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে তারা প্রচারণার সুযোগ পাচ্ছেন। তখন নির্বাচনের আমেজ চলে আসবে। এছাড়াও আমরা সিলেটে সকল দলের প্রার্থীদের এক মঞ্চে জনগণের মুখোমুখি করবো। সেখানে তারা ভোটারদের সামনে নির্বাচনী ইশতেহার দিতে পারবেন।’

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন