কঠিন চ্যালেঞ্জে সিলেটের প্রার্থীরা ১৯ আসনের ৮টি চায় শরিকরা
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপোড়েন দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের ছয়টি সংসদীয় আসনে শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা এখন চরম অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। জোটের ভেতর সমঝোতার অভাব, পাল্টাপাল্টি দাবি ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তহীনতার কারণে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি, আসন সমঝোতায় বিলম্ব হওয়ায় ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা রয়েছেন ঘোষণার অপেক্ষায়। আর প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ইতোমধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠ গোছাতে শুরু করেছে। সেখানে শরিক দলের প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় প্রচারণায় পিছিয়ে পড়ছেন।
জোটসূত্রে জানা গেছে, জামায়াতের কাছে শরিক দলগুলোর দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে কয়টি আসন চায় সেগুলো হলো- সিলেট-১, সিলেট-২, সিলেট-৩, সিলেট-৫, সুনামগঞ্জ-৩, মৌলভীবাজার-৪, হবিগঞ্জ-২, হবিগঞ্জ-৪ আসন।
এছাড়া আরও কিছু আসনে জামায়াত নিজস্ব প্রার্থী দিতে আগ্রহী হলেও শরিক দলগুলো তাদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অবস্থান ও জনপ্রিয়তার যুক্তি তুলে ধরে আসন ছাড়তে নারাজ। আবার কোথাও কোথাও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মানতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। ফলে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী প্রস্তুতি কার্যত ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, মঙ্গলবার থেকে ১১ দলীয় জোটের শরীকদের আসন সমঝোতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। অবশেষে বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের অনুপস্থিতিতেই ১০ দলের জরুরী সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীকে ১৭৯, এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (মামুনুল হক অংশ) ২০, খেলাফত মজলিস ১০, এলডিপি ৭, নেজামে পার্টি ২, এবি পার্টি ৩, বিডিপিকে ২টি আসন দেয়া হয়। ইসলামী আন্দোলন, জাগপা ও খেলাফত আন্দোলনে কয়টি আসন দেয়া হবে তা পরে জানানো হবে।
এই তিন দলের জন্য ৪৭টি আসন বাকি রাখা হয়। তবে, ঘোষিত ২৫৩ আসনে কোন প্রার্থীকে কোন আসনে দেয়া হয়েছে তা ঘোষণা করা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট-১ আসনে এহতেশামকে প্রার্থী চায় এনসিপি। কিন্তু মনোনয়ন জটিলতায় এখনো তা ঝুলে রয়েছে। তবে, দীর্ঘদিন থেকে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। এনসিপির এহতেশামের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে মনোনয়ন আটকে গেলে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। তার আপিল এখনো শুনানী হয়নি। শুনানীতে ফিরে পেলে হয়তো তিনি জোটের প্রার্থী হতে পারেন। কিন্তু এনসিপির প্রার্থী প্রার্থীতা ফিরে না পেলে বা শুনানীর আগে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করলে জামায়াতের হাবিবুর রহমানকেই প্রার্থী ঘোষণা করা হতে পারে।
সিলেট-২ আসনে শরিক দল খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাছির আলী ইতোমধ্যে জোটের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গণসংযোগ শুরু করলেও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল হান্নান ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এ আসনে জামায়াত ও মজলিসের মধ্যে কে হবেন জোটের একক প্রার্থী, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। পৃথক কর্মসূচি, আলাদা গণসংযোগ এবং সমর্থকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা যাওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জামায়াত জোট এ আসন খেলাফত মজলিসকেই ছেড়ে দিতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সিলেট-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (মামুনুল হক অংশ) আল্লামা নুরউদ্দিন গহরপুরী (রহ.)-এর পুত্র মুসলেহ উদ্দিন রাজুকে জোটের প্রার্থী চায়। আবার এ আসনে দিলওয়ার হোসেনকে জোটের প্রার্থী চায় খেলাফত মজলিস। তবে, এ আসনে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে ধরা হচ্ছে জামায়াত নেতা মাওলানা লোকমান আহমদকে। তিনি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে মাঠে রয়েছেন। দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জের ভোটে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। এতে করে সিলেট-৩ আসন শরিকদের ছাড়তে নারাজ জামায়াত।
সিলেট-৫ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এখনো আসন সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলেও বসে নেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা। জামায়াতের জেলার নায়েবে আমির মাওলানা আনওয়ার হোসেন খান শক্ত অবস্থান তৈরী করেছেন। জোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন ইসলামী আন্দোলনের মুফতি রেজাউল করিম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, খেলাফত মজলিসের সিলেট জেলার উপদেষ্টা আবুল হাসান ও ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী।
১১ দলীয় জোটের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মূল লড়াই চলছে মূলত জামায়াত ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর মধ্যে। জোট থেকে জামায়াতের হাফিজ আনওয়ার হোসেন খান ও খেলাফত মজলিসের মাওলানা আবুল হাসান থেকে যেকোনো একজন মনোনয়ন পাবেন।
সুনামগঞ্জ-৩ (শান্তিগঞ্জ-জগন্নাথপুর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কে হচ্ছেন- এ নিয়ে নেতাকর্মিদের মাঝে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ আসনে মাঠে রয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইয়াছিন খান। তিনি ইতিমধ্যে নির্বাচনী মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি এ আসনে শক্তিশালি প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী। তিনি একসময় জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। সুনামগঞ্জ-৩ নির্বাচনী এলাকা থেকে জমিয়তের প্রার্থী হয়ে চারবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন শাহীনুর পাশা। ২০০৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৩ সালে শৃঙ্খলাবিরোধী অবস্থানের কারণে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে বহিস্কার করা হয় শাহীনুর পাশাকে। পরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে যোগদান করেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১১ দলীয় জোটের শরিক হওয়ায় তিনি এই আসনে জোটের প্রার্থী হতে চাইছেন। নির্বাচনী এলাকায় সভা-সমাবেশ গণসংযোগ করছেন গেল ছয় মাস ধরেই।
এছাড়া এ আসন থেকে এবি পার্টি থেকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী সৈয়দ তালহা আলমও জোটের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. আব্দুর রব। এই আসন চায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। তারা প্রার্থী দিয়েছে বরুণার পীর আল্লামা শায়খ খলিলুর রহমান হামিদী (রহ.)-এর জ্যেষ্ঠ ছেলে শেখ নুরে আলম হামিদীকে। জামায়াত তাকেই এ আসনে ছেড়ে দিতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরিগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান আজমীর সঙ্গে মাঠে রয়েছেন খেলাফত মজলিসের আমির বানিয়াচংয়ের বড় হুজুর খ্যাত আব্দুল বাছিত আজাদ। খেলাফত মজলিসের সঙ্গে জোট সমঝোতায় এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হতে পারেন আব্দুল বাছিত আজাদ। এছাড়াও এই আসনে বিভিন্ন ইসলামি দলের প্রার্থীরা কাজ করছেন।
হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠে কাজ করছিলেন জেলা জামায়াতের আমির কাজী মাওলানা মুখলিছুর রহমান। এই আসনে প্রার্থী ছাড় দেওয়ার গুঞ্জন ছিল। এই গুঞ্জনের মধ্যেই সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানকে সমর্থন জানিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন জামায়াতের প্রার্থী মুখলিছুর রহমান। তাদের দুজনকে মনোনয়ন না দেয়ায় এ আসনে খেলাফত মজলিসের ড. আহমদ আব্দুল কাদেরকে জোটের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা হতে পারে।
অন্যদিকে স্থানীয় সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সিলেট বিভাগের চারটি জেলার ১৯টি সংসদীয় আসন চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে সিলেট-৩ আসনে লোকমান আহমদ, সিলেট-৪ আসনে জয়নাল আবেদীন, সিলেট-৬ আসনে মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সুনামগঞ্জ-২ আসনে মুহাম্মদ শিশির মনির, মৌলভীবাজার-১ আসনে আমিনুল ইসলাম এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে মো. শাহজাহান আলী শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তাঁদের জয় পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে এলাকায় প্রচার আছে।
অন্যদিকে সিলেট-১ আসনে মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট-৫ আসনে আনোয়ার হোসেন খান এবং সুনামগঞ্জ-৫ আসনে আবদুস সালাম আল মাদানী তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবেন বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা আছে। এর বাইরে অপর প্রার্থীরা মাঠপর্যায়ে ব্যাপকভাবে কাজ করছেন।
খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব ও জোটের লিয়াঁজো কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মুনতাছির আলী সিলেটের মানচিত্রকে বলেন, ‘সিলেট-৫ ও সিলেট-২ খেলাফত মজলিস চেয়েছিল। সিলেট-২ আসন মজলিসকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, এটা চূড়ান্ত। ইতোমধ্যে ১১ দলীয় জোট সবকটি আসন চূড়ান্ত করেছে। কিছু আসনে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ঘোষণা একটু বিলম্ব হচ্ছে। তবে স্বল্প সময়েই ঘোষণা করা হবে।’ দেরীতে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও নির্বাচনী মাঠে কোন প্রভাব পড়বে না বলে জানান তিনি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘জোটের শরিক দলগুলোর সাথে আলোচনা শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রেসবিফিংয়ে মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে কয়টি আসন ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে, কাকে কোন আসনে দেয়া হয়েছে, সেই তালিকা পরে ঘোষণা করা হবে।’
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন