বিশেষ প্রতিবেদন

পাল্টে যেতে পারে ভোটের সমীকরণ   

সিলেটের ৬ টি আসনে দেড় লাখ নতুন ভোটার

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারী ২০২৬ ১৫:১৭

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে নতুন ভোটারদের উপস্থিতি। এবারের নির্বাচনে সিলেটের ছয়টি আসনে প্রায় দেড় লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন ভোটার তালিকায়। এদের অধিকাংশই তরুণ, যারা এবারই প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন ভোটাররাই নির্বাচনের ফলাফলের গতিপথ পাল্টে দিতে পারেন। তাদের প্রত্যাশা, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই দেশ গণতান্ত্রিক, আধুনিক ও সম্ভাবনাময় পথে এগিয়ে যাবে। আর তরুণদের এই জাগরণই পাল্টে দিতে পারে এবারের নির্বাচনী সমীকরণ।


আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ভোটারদের মাঝে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও আগ্রহের কমতি নেই। তাদের অনেকেই এই সুযোগকে দেখছেন নাগরিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে। যারা চব্বিশের আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও স্বচ্ছ রাজনীতি এই চারটি বিষয়ই তরুণদের ভাবনায় সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে।


তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলো হচ্ছে, কর্মসংস্থান, মাদক নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক শিক্ষা, ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপদ সমাজ। তারা মনে করেন, এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলেই একজন প্রার্থী তাদের আস্থা অর্জন করতে পারবেন। পাশাপাশি তারা দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির কথাও জোর দিয়ে তুলে ধরছেন।


সিলেট নগরী থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত নতুন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এখন আর শুধু দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে চান না। বরং প্রার্থীর ব্যক্তিগত সততা, এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা এবং সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি। অনেক তরুণ বলছেন, ‘আমাদের ভোটে যেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে ওঠে।’


সিলেট সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আবিদ রহমান অনিক বলেন, ‘তরুণদের জাগরনেই আমাদের নতুন বাংলাদেশ। এ দেশ সঠিক পথে এগুতে, সঠিক প্রতিনিধিকেই নির্বাচিত করা হবে।’


একই মত প্রকাশ করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী সাহেলা শারমিন, জেবিন রহমান ও রাসেল হাসান। তাদের মতে, রাজনীতিতে তরুণদের ভাবনা ও স্বপ্ন প্রতিফলিত না হলে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়।
এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিবেন সিলেট নগরীর রিকশা চালক হেলাল মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব পরিকল্পনা দেখতে চাই। আমাদের ভোট এমন একজনকে দেব, যিনি আমাদের পাশে থাকবেন।’


এদিকে, পিছিয়ে নেই গ্রামাঞ্চলের তরুণ ভোটাররাও। বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় নতুন ভোটাররা খোঁজখবর নিচ্ছেন প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় আলোচনা সভা এবং গণসংযোগের মাধ্যমে তারা নিজেরাই তথ্য সংগ্রহ করছেন। অনেকেই বলছেন, তারা আর শুধু কথার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না; তারা চান কাজের প্রমাণ।


দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কামরুল ইসলাম বলেন, ‘এটাই আমার জীবনের প্রথম ভোট। আমি চাই এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি আমাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নে কাজ করবেন।’ 


বিশ্বনাথ পৌর এলাকায় নতুন ভোটার হয়েছেন সঞ্জয় দাস শুভ। তিনি ভোট দিতে চান একজন সৎ, শিক্ষিত ও জনবান্ধব প্রার্থীকে। যিনি এলাকায় স্বচ্ছ রাজনীতির পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিবেন। জকিগঞ্জ উপজেলার পায়েল আহমদ জানান, ‘প্রার্থীদের নির্বাচনি ইশতেহারের উপর ভিত্তি করে ভোট দিব।’ কোম্পানীগঞ্জের কলেজ পড়ুয়া জমির আহমদ বলেন, ‘তরুণ শক্তিকে গুরুত্ব না দিলে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনই স্থায়ী হবে না।’


এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ প্রথমবারের মতো ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। তবে, কিছু সংখ্যক ভোটার স্থান পরিবর্তন করেও তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।


নির্বাচন কমিশনের খসড়া ভোটার তালিকা সূত্রে জানা যায়, সিলেটে দেড় বছরে ভোটার বেড়েছে এক লাখ ৫৫ হাজার ৪৭০ জন। তার মধ্যে পুরুষ ৭০ হাজার ৭২ জন এবং নারী ৫৯ হাজার ৯৬১ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার বেড়েছে পাঁচজন। 
এরমধ্যে সিলেট-১ আসনে (সিটি করপোরেশন ও সদর) ভোটার বেড়েছে ৪০ হাজার ১৫০জন। বর্তমানে এই আসনে মোট ভোটার ছয় লাখ ৭৪ হাজার ১৭১জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার তিন লাখ ৪৯ হাজার ৫১৯ জন এবং নারী ভোটার তিন লাখ ২৪ হাজার ৬৩৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৩ জন। এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার ছিল ছয় লাখ ৩৪ হাজার ২১ জন।


সিলেট-২ আসনে (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) ভোটার বেড়েছে ২০ হাজার ৭ জন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার ছিল তিন লাখ ৪৪ হাজার ৭২৯ জন। বর্তমানে এই আসনে মোট ভোটার রয়েছেন তিন লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৮৬ হাজার ১৮৭ জন ও নারী ভোটার এক লাখ ৭৮ হাজার ৬১২ জন। 


সিলেট-৩ (দক্ষিণসুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল তিন লাখ ৮৬ হাজার ৪১২ জন। বর্তমানে এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ২৯ হাজার ৭৭৪ জন। সে হিসেবে ভোটার বেড়েছে ৪৩ হাজার ৩৬২ জন। এবার মোট ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৫ হাজার ৮৩৪ জন এবং নারী ভোটার এক লাখ ৯৮ হাজার ৫১৩ জন। এই আসনে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার একজন।


সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে ভোটার বেড়েছে ২৭ হাজার ৫৩১ জন। বর্তমানে এই আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ২ হাজার ৬৫২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৬১ হাজার ৬২ জন এবং নারী ভোটার দুই লাখ ৪১ হাজার ৫৮৯ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার একজন। এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার সংখ্যা ছিল চার লাখ ৭৫ হাজার ১২১ জন।


সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে। এই আসনে ভোটার বেড়েছে সাত হাজার ৬৫৭ জন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল চার লাখ ২ হাজার ২৯৯ জন। হালনাগাদ করার পর খসড়া ভোটার তালিকা অনুসারে বর্তমানে এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯ হাজার ৯৫৬ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ১১ হাজার ৬৬৭ জন এবং নারী ভোটার এক লাখ ৯৮ হাজার ২৮৯ জন। 


সিলেট-৬ আসনে (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) ভোটার বেড়েছে ১৬ হাজার ৭০০জন। খসড়া ভোটার তালিকার প্রাপ্ত তথ্যমতে বর্তমানে এই আসনে মোট ভোটার রয়েছেন চার লাখ ৮৯ হাজার ৪৪৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৪৮ হাজার ২০৮ জন এবং নারী ভোটার দুই লাখ ৪১ হাজার ২৪১ জন। এই আসনেও তৃতীয় লিঙ্গের কোনো ভোটার নেই। এরআগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোটার সংখ্যা ছিল চার লাখ ৭২ হাজার ৭৪৯ জন।


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সিলেটের তরুণদের জন্য শুধু একটি ভোটের দিন নয়, বরং নিজেদের মত প্রকাশের একটি বড় সুযোগ। তাদের প্রত্যাশা, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই দেশ গণতান্ত্রিক, আধুনিক ও সম্ভাবনাময় পথে এগিয়ে যাবে। 
উল্লেখ্য, সিলেটের ছয়টি আসনে মোট ভোটার ২৮ লাখ ৭০ হাজার ৮০১ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৭ জন এবং নারী ভোটার ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৭। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৫ জন।
    
 

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন