মানুষের জীবনপথ কখনো একাকী চলে না। আমরা প্রতিদিন যাদের সঙ্গে উঠি-বসি করি, কথা বলি, হাসি-কাঁদি—তাদের প্রভাব অজান্তেই আমাদের চিন্তা, চরিত্র ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। আজকের ব্যস্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও ডিজিটাল জীবনে এই প্রভাব আরও গভীর ও দ্রুত। তাই ইসলাম শুরু থেকেই মানুষের সঙ্গ নির্বাচন ও পরামর্শ গ্রহণের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ও দূরদর্শী নির্দেশনা দিয়েছে। নবীজি (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন— সব সম্পর্ক ধরে রাখাই বুদ্ধিমত্তা নয়; বরং সঠিক সম্পর্ক বেছে নেওয়াই প্রকৃত প্রজ্ঞা।
সঙ্গী নির্বাচনে জীবনের তিনটি মৌলিক নীতি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
اعْتَزِلْ عَنْ صَاحِبٍ يُؤْذِيكَ، وَصَاحِبِ الْأَخْيَارَ وَإِنْ قَلُّوا، وَشَاوِرْ فِي أَمْرِكَ الَّذِينَ يَخَافُونَ اللَّهَ
‘সরে যাও এমন সঙ্গী থেকে, যে তোমাকে কষ্ট দেয়। সৎ লোকদের সঙ্গ গ্রহণ করো—সংখ্যায় তারা কম হলেও। আর যে কোনো বিষয়ে পরামর্শ করো তাদের সঙ্গে, যারা আল্লাহকে ভয় করে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি)
এই হাদিসটি মানুষকে তিনটি মৌলিক জীবনীমূলক নীতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে—
১. ক্ষতিকর সঙ্গ ত্যাগ করা
২. সৎ সঙ্গ গ্রহণ করা
৩. তাকওয়াবান মানুষের পরামর্শ গ্রহণ করা
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে হাদিসের ব্যাখ্যা
কষ্টদায়ক সঙ্গী থেকে দূরে থাকা
আজকের সময়ে কষ্টদায়ক সঙ্গী মানেই শুধু খারাপ মানুষ নয়—
> যে সবসময় হতাশা ছড়ায়
> যে গিবত, হিংসা ও কটুক্তিতে অভ্যস্ত
> যে পাপকে স্বাভাবিক ও দ্বীনকে তুচ্ছ করে
> এমনকি ভার্চুয়াল জগতের বিষাক্ত সম্পর্কও
যে সঙ্গ আজ পাপের দিকে টানে, কাল সে-ই আখিরাতে আফসোসের কারণ হবে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ
‘সেদিন (কিয়ামতের দিন) বন্ধুরাই একে অন্যের শত্রু হয়ে যাবে—তবে মুত্তাকিরা ছাড়া।’ (সুরা যুখরুফ: আয়াত ৬৭)
সৎ সঙ্গী— সংখ্যায় কম হলেও যথেষ্ট
আজ অনেকেই বন্ধুর সংখ্যা নিয়ে গর্ব করে, কিন্তু ইসলাম বন্ধু নয় বরং গুণকে প্রাধান্য দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপরেই থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের উচিত, কাকে সে বন্ধু বানাচ্ছে তা ভেবে দেখা।’ (আবু দাউদ ৪৮৩৩, তিরমিজি ২৩৭৮)
এমন একজন বন্ধু থাকাই অনেক সময় শত জনের চেয়েও বেশি কল্যাণকর। কেননা একজন সৎ বন্ধু—
> আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়
> পাপে বাধা দেয়
> বিপদে সৎ পরামর্শ দেয়
পরামর্শ নাও তাকওয়াবান মানুষের কাছ থেকে
আজকের যুগে পরামর্শ পাওয়া সহজ— কিন্তু সঠিক পরামর্শ পাওয়া কঠিন। অনেকেই এমন পরামর্শ দেয়, যা দুনিয়ায় লাভ দেখালেও আখিরাতে ধ্বংস ডেকে আনে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ
‘তুমি তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো কাজে-কর্মে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৫৯)
তাহলে কার সঙ্গে করবেন পরামর্শ?
হাদিসে এর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে— যারা আল্লাহকে ভয় করে, অর্থাৎ তাকওয়াবান, ন্যায়পরায়ণ ও আখিরাতমুখী মানুষ।
তাই বাস্তব জীবনের জন্য কয়েকটি নসিহত পালন করা জরুরি—
> সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘পুরোনো’ নয়, ‘কল্যাণকর’ হওয়াকে অগ্রাধিকার দিন
> বন্ধু বাছাইয়ে দ্বীন ও চরিত্রকে মানদণ্ড করুন
> সিদ্ধান্তের আগে তাকওয়াবান মানুষের সঙ্গে বসুন
> সোশ্যাল মিডিয়াতেও সঙ্গ বাছাইয়ে সচেতন হোন
> বাস্তব জীবনের জন্য সংক্ষিপ্ত নসিহত
> সম্পর্ক বাছাইয়ে আবেগ নয়, তাকওয়াকে অগ্রাধিকার দিন
> পুরোনো সম্পর্ক হলেও ক্ষতিকর হলে সাহসের সঙ্গে দূরে থাকুন
> বন্ধুর সংখ্যা নয়, চরিত্র দেখুন
এ কারণেই হাদিস আমাদের শেখায়—
اعْتَزِلْ عَنْ صَاحِبٍ يُؤْذِيكَ، وَصَاحِبِ الْأَخْيَارَ وَإِنْ قَلُّوا، وَشَاوِرْ فِي أَمْرِكَ الَّذِينَ يَخَافُونَ اللَّهَ
‘সরে যাও এমন সঙ্গী থেকে, যে তোমাকে কষ্ট দেয়। সৎ লোকদের সঙ্গ গ্রহণ করো—সংখ্যায় তারা কম হলেও। আর যে কোনো বিষয়ে পরামর্শ করো তাদের সঙ্গে, যারা আল্লাহকে ভয় করে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি)
মনে রাখতে হবে
সব সম্পর্ক ধরে রাখাই ইমান নয়; বরং যেসব সম্পর্ক আল্লাহর পথে সাহায্য করে, সেগুলো আঁকড়ে ধরাই বুদ্ধিমত্তা। যে সঙ্গ আপনাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরায়, তা থেকে সরে আসাই আত্মরক্ষা। আর যে সঙ্গ আপনাকে আল্লাহর দিকে ডাকে— সংখ্যায় কম হলেও সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় নেয়ামত। সঙ্গ বদলালে জীবন বদলায়, আর জীবন বদলালে আখিরাতের পরিণতিও বদলে যেতে পারে।
হে আল্লাহ! আমাদের সৎ সঙ্গ দান করুন, অসৎ সঙ্গ থেকে রক্ষা করুন এবং তাকওয়াবানদের পরামর্শ গ্রহণ করার তৌফিক দিন। আমিন।
ধর্ম থেকে আরো পড়ুন