সিলেট

জিরার বস্তায় রহস্যের গন্ধ

শুল্ক ফাঁকির মামলায় আসামি নেই কেউ

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ ১৬:০৮

১০ লাখ টাকার জিরা জব্দ হয়েছে। পিকআপ জব্দ হয়েছে। কিন্তু যারা এই জিরা কান্ডে সরাসরি জড়িত, তারা রয়ে গেছেন আইনের নাগালের বাইরে। স্থানীয়দের মতে জিরার বস্তায় শুধু মশলার গন্ধ নয়; রহস্যের গন্ধও জড়িয়ে আছে। 


রাত তখন গভীর। সিলেটের নাইওরপুলে এস এ পরিবহনের প্রাঙ্গণে একটি পিকআপ ঢুকছে চুপিসারে। পেছনে ভারতীয় জিরার বস্তা। সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল ধাওয়া করল। পিকআপ থামল। জিরা জব্দ হলো। কিন্তু চালক ততক্ষণে এস এ পরিবহনের গেট দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। 


এরপর জিরার দাবিদার একজন লোক নিজেই এসে হাজির হলেন পুলিশের সামনে। কাগজপত্র দেখালেন। পুলিশ দেখল সেই কাগজে গরমিল। তবুও মামলায় তাঁর নাম নেই। চালকের নাম নেই। আসামি তিন-চারজন অজ্ঞাতনামা। এটা গত ১৪ মে সিলেটে সংঘটিত একটি চোরাচালান মামলার চিত্র। এটি নিয়ে তোলপাড় চলছে সিলেট জুড়ে। 


গত ১৪ মে রাতে সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল নাইওরপুল এস এ পরিবহনের প্রাঙ্গণ থেকে জব্দ করে একটি পিকআপ গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ন-১৭-৮০৪৮) এবং তাতে থাকা ৭০ বস্তা ভারতীয় জিরা, যার ওজন ২১০০ কেজি এবং বাজারমূল্য প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। 


শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে আনা এই অবৈধ ভারতীয় জিরার চালানটি কোথা থেকে এল, কোথায় যাচ্ছিল সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে মামলার গতিপ্রকৃতি। 
পুলিশ যখন মালামাল জব্দ করছে, তখন হঠাৎ ঘটনাস্থলে হাজির হলেন মো. আব্দুস সাত্তার খান মিন্টু (৫০) নামে এক ব্যক্তি। তিনি দাবি করলেন- এই জিরা তাঁর। শাহপরাণ থানার একটি পুরনো মামলার (জিআর-৪৯/২০২৩) সূত্র ধরে আদালত থেকে নিলামে কিনেছেন তিনি। 


কাগজপত্রও দেখালেন। কিন্তু পুলিশ কাগজ মিলিয়ে দেখল তাতে গরমিল রয়েছে। আদালতের কাগজে লেখা ১০৫ বস্তা, প্রতি বস্তা ২০ কেজি। বাস্তবে পাওয়া গেছে ৭০ বস্তা, প্রতি বস্তা ৩০ কেজি। বস্তার সংখ্যা আলাদা, ওজনও আলাদা। যা সন্দেহের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, অবৈধ জিরার চালানকে বৈধতার মোড়কে ঢাকতেই এই ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছিল বলে পুলিশের ধারণা। পুলিশের নিজস্ব এজাহারেও সেই অসংগতির কথা স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে। 


পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে সন্দেহজনক কাগজপত্র দেখিয়েছেন আব্দুস সাত্তার মিন্টু। নাম, পরিচয়, সবই জানা। তারপরও মামলায় তাঁর নাম নেই। পুলিশের ধাওয়ার মুখে গাড়ি ফেলে পালিয়েছেন চালক। কিন্তু তাঁর নামও মামলায় নেই। মামলায় আসামি করা হয়েছে তিন থেকে চারজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে। পরে আব্দুস সাত্তার মিন্টুকে থানায় আসতে বলা হলে তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। তাঁকে আর ডাকা হয়নি, খোঁজাও হয়নি। 


জনাকীর্ণ এলাকায়, পুলিশি অভিযানের মাঝখানে, গাড়ি রেখে চালক কীভাবে নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেল এই প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মধ্যে। এস এ পরিবহনের গেটের ভেতর দিয়ে পালানোর অর্থ হলো, সেই গেট সেই মুহূর্তে খোলা ছিল এবং পালানোর পথ আগে থেকেই জানা ছিল। এটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল বলেই অনেকে মনে করছেন। 


এই ঘটনায় সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির এসআই শিপলু চৌধুরী বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে কোতোয়ালী মডেল থানায় মামলা করেছেন (মামলা নং-৫৫/২৫৩)। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে কোতোয়ালী থানার এসআই (নিরস্ত্র) অনুপ কুমার চৌধুরীকে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, অজ্ঞাতনামা আসামির মামলা অনেক সময়ই তদন্তের গভীরে যায় না Ñ কালক্রমে হারিয়ে যায়। 


এই মামলাকে ঘিরে এখন যে প্রশ্নগুলো সামনে আসছে, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে সচেতন মহল মনে করছেন। তাদের প্রশ্নÑ পুলিশের সামনে সন্দেহজনক কাগজ দেখানো ব্যক্তিকে আসামি না করার কারণ কী? জনাকীর্ণ এলাকায় পুলিশি অভিযানের মাঝখানে চালক কীভাবে পালিয়ে গেলেন? অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে মামলা করে কি আসলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে? 
এ ব্যাপারে কোতোয়ালী থানার ওসি মাইনুল জাকিরের বক্তব্যও এই রহস্যকে আরও ঘন করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। তবে কারো নাম নেই।’ 

সিলেট থেকে আরো পড়ুন


 শিরোনাম
news icon জৈন্তাপুর সীমান্তে অনুপ্রবেশকালে নারী-শিশুসহ আটক ১৩ news icon সিলেটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অরাজকতা  news icon নগর ভবনের সামনে থালা হাতে হকারদের ধর্মঘট news icon নগর ভবনের সামনে হকারদের অবস্থান ধর্মঘট news icon হবিগঞ্জে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, নিহত বাবা ও ছেলে news icon টেকসই আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে দুর্যোগকালে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হবে: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী news icon টোকেনে শেষ সারাদিনের উপার্জন news icon গোয়াইনঘাটে গভীর রাতে ঘরে দুর্বৃত্তদের হানা, ছুরিকাঘাতে বৃদ্ধার মৃত্যু news icon বিছানাকান্দিতে পানিতে ডুবে নিখোঁজ শাবি শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার news icon চামড়া শিল্পকে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়কারী খাত হিসেবে গড়ে তোলা হবে