সিলেট

চোরাই ভারতীয় জিরা বৈধ করতে জাল কাগজই ঢাল! 

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ ১৬:১৩

সিলেট সীমান্তে গরু, চিনি কিংবা কসমেটিকসের পর এবার যুক্ত হয়েছে ভারতীয় জিরা। বাজারে চাহিদা ও দাম বেশি হওয়ায় সংঘবদ্ধ চক্র কোটি কোটি টাকার জিরা পাচার করছে অভিনব কৌশলে। কখনও বালুভর্তি ট্রাকের নিচে, কখনও অ্যাম্বুলেন্সে, আবার কখনও কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল হিসেবে। 


খোজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট সীমান্ত এখন শুধু গরু, চিনি কিংবা কসমেটিকস চোরাচালানের রুট নয়, নতুন করে ‘হাই ভ্যালু’ পণ্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে ভারতীয় জিরা। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র কোটি কোটি টাকার জিরা দেশে ঢুকিয়ে বাজারজাত করছে। আর এসব চালান বহনে ব্যবহার করা হচ্ছে অভিনব কৌশল। কখনও বালুভর্তি ট্রাকের নিচে, কখনও অ্যাম্বুলেন্সে, আবার কখনও কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল হিসেবে পাচার হচ্ছে এসব জিরা। 


সম্প্রতি সিলেট, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও হবিগঞ্জে ধারাবাহিক অভিযানে পুলিশ ও বিজিবির হাতে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা জব্দ হওয়ার ঘটনায় চোরাচালান চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও কৌশল সামনে এসেছে। 


সর্বশেষ গত ১৪ মে রাতে সিলেট নগরীর নাইওরপুল এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যান থেকে ৭০ বস্তায় ২, ১০০ কেজি ভারতীয় জিরা জব্দ করে কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ। পিকআপে থাকা ব্যক্তিরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়। 


পরে আব্দুস সাত্তার খান মিন্টু নামের এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলে এসে দাবি করেন, তিনি আদালতের উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে জিরাগুলো কিনেছেন। কিন্তু তার দেখানো কাগজপত্রে ১০৫ বস্তা, প্রতি বস্তায় ২০ কেজি জিরার উল্লেখ থাকলেও ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় ৭০ বস্তা, প্রতিটিতে ৩০ কেজি করে জিরা। মোট ওজন একই থাকলেও বস্তার সংখ্যা ও ওজনে বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি হয়। 


তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের কাগজপত্র ব্যবহার করে বৈধ নিলামের আড়ালে অবৈধ ভারতীয় পণ্য বাজারে ছাড়ার একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। 


এছাড়া গোয়াইনঘাট এলাকায় সম্প্রতি একটি বালুভর্তি ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে ৭৬ বস্তা ভারতীয় জিরা উদ্ধার করে পুলিশ। ট্রাকটির উপরের অংশে ছিল বালু, নিচে বিশেষভাবে তৈরি গোপন চেম্বারে রাখা হয়েছিল জিরার বস্তা। 


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সীমান্ত থেকে জিরা আনার পর প্রথমে তা ছোট যানবাহনে বিভিন্ন ‘সেফ হাউজে’ নেওয়া হয়। পরে বড় ট্রাকে অন্যান্য বৈধ পণ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো হয়। 


তদন্তে উঠে এসেছে, চোরাকারবারিরা নজরদারি এড়াতে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করছে। রোগী পরিবহনের গাড়ি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তল্লাশি এড়ানো সহজ হয়। এছাড়া পার্সেল ও কুরিয়ার সার্ভিসের নাম ব্যবহার করে ছোট ছোট চালানে জিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। 


একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এসব চক্রের সঙ্গে সীমান্তভিত্তিক বহুমুখী চোরাকারবারি সিন্ডিকেট জড়িত। তাদের মধ্যে কেউ ভারতীয় অংশে সংগ্রহের দায়িত্বে, কেউ সীমান্ত পারাপারে, আবার কেউ ভুয়া কাগজপত্র তৈরি ও বাজারজাতকরণে কাজ করছে। 


গত কয়েকদিন আগে বিয়ানীবাজার ও বড়লেখা এলাকায় বিজিবির অভিযানে ১৯২ বস্তায় প্রায় ৫, ৭৬০ কেজি ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়। এ সময় একটি সংঘবদ্ধ চক্র জব্দকৃত জিরা ছাড়াতে আদালতের নথি ও ভুয়া কাগজপত্র দেখানোর চেষ্টা করে বলে জানা গেছে। 


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতের নিলাম সংক্রান্ত প্রকৃত কাগজের অনুকরণে জাল নথি তৈরি করে চোরাই মালকে বৈধ দেখানোর প্রবণতা বাড়ছে। এতে রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি তদন্তও জটিল হয়ে পড়ছে। 


অনুসন্ধানে জানা গেছে সিলেটের কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও বড়লেখা সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে ভারতীয় জিরা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সীমান্তের বিভিন্ন ‘ক্যারিয়ার’ মাথায় বা ছোট নৌকায় করে এসব পণ্য নির্দিষ্ট পয়েন্টে পৌঁছে দেয়। পরে স্থানীয় গুদামে মজুদ করে সুযোগ বুঝে বড় চালান পাঠানো হয়। 


ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় জিরার দাম তুলনামূলক কম এবং বাজারে এর চাহিদা বেশি। বৈধভাবে আমদানি করলে শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারিরা কম দামে পণ্য এনে বাজার দখলের চেষ্টা করছে। 


এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব, অন্যদিকে বৈধ আমদানিকারক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। 


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, সীমান্ত রুট, পরিবহন নেটওয়ার্ক ও গুদাম সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে আদালতের নিলাম সংক্রান্ত নথি যাচাই ব্যবস্থাও ডিজিটাল ও কঠোর করার দাবি উঠেছে। 


সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেলুর রহমান বলেন, সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 


 

সিলেট থেকে আরো পড়ুন


 শিরোনাম
news icon জৈন্তাপুর সীমান্তে অনুপ্রবেশকালে নারী-শিশুসহ আটক ১৩ news icon সিলেটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অরাজকতা  news icon নগর ভবনের সামনে থালা হাতে হকারদের ধর্মঘট news icon নগর ভবনের সামনে হকারদের অবস্থান ধর্মঘট news icon হবিগঞ্জে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, নিহত বাবা ও ছেলে news icon টেকসই আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে দুর্যোগকালে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হবে: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী news icon টোকেনে শেষ সারাদিনের উপার্জন news icon গোয়াইনঘাটে গভীর রাতে ঘরে দুর্বৃত্তদের হানা, ছুরিকাঘাতে বৃদ্ধার মৃত্যু news icon বিছানাকান্দিতে পানিতে ডুবে নিখোঁজ শাবি শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার news icon চামড়া শিল্পকে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়কারী খাত হিসেবে গড়ে তোলা হবে