সিলেট

আপা ডাকায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ ২১:৪৬

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় বনফুল অ্যান্ড কোম্পানির তাজপুর শাখার এক কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৯ মে ঈদের পরদিন বিকেলে নিজের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ ক্রেতার বেশে তাজপুর বনফুল শাখায় যান ইউএনও মুনমুন নাহার আশা। সে সময় শাখা ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া দোকানের বাইরে ছিলেন। ইউএনও দোকানের কর্মচারী আব্দুল মান্নানের কাছে চকোলেট আইসক্রিম চাইলে তিনি জানান, চকোলেট আইসক্রিম নেই, অন্য কোনো আইসক্রিম নিতে পারেন।

পরে ইউএনও মিষ্টির কাউন্টারে গিয়ে বিভিন্ন মিষ্টি সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আপা’ গতকাল ঈদের কারণে নতুন মিষ্টি আসেনি। আজকের মিষ্টিগুলো বিক্রি হয়ে গেছে। এগুলো শুকনো মিষ্টি, দুই-চার দিন থাকলেও নষ্ট হয় না।

অভিযোগ অনুযায়ী ‘আপা’ সম্বোধন করায় ইউএনও ক্ষুব্ধ হয়ে আব্দুল মান্নানকে বলেন, তুমি আমাকে চিনো? আমাকে আপা ডাকছ কেন? আমি ম্যাজিস্ট্রেট। তোমাদের বাসি মিষ্টি বিক্রির অভিযোগ বালাগঞ্জের ইউএনওসহ অনেকেই আমার কাছে দিয়েছে। আমি এখন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করব।

পরে তিনি শাখা ব্যবস্থাপককে ডাকার নির্দেশ দেন। কর্মচারী জানান, ম্যানেজার বাইরে আছেন। এতে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে জেল-জরিমানার ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন আব্দুল মান্নান।

তিনি জানান, পুলিশি হয়রানি ও মানসিক চাপে এক পর্যায়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরে ম্যানেজার সুহেল বড়ুয়া এসে ইউএনওর কাছে ক্ষমা চান। এরপর আব্দুল মান্নানকে ডেকে এনে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

আব্দুল মান্নানের দাবি, তিনি প্রথমে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু ছয় মাসের জেল ও আরও বেশি জরিমানার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

গত ১ জুন অফিস খোলার দিন হার্টের রোগী আব্দুল মান্নান জরিমানার পরিমাণ কমানোর অনুরোধ জানাতে ইউএনও কার্যালয়ে যান। সেখানে তিনি কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সে সময় উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তার আবেদনেও সাড়া না পেয়ে তিনি সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার শরণাপন্ন হন এবং বিষয়টি দেখার অনুরোধ জানান।

আব্দুল মান্নান বলেন, আমি ২৬ বছর ধরে বনফুলে চাকরি করছি। চাকরি জীবনে অনেক ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু এমন ঘটনার সম্মুখীন কখনও হইনি। আমার কাছে পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত মনে হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ঘটনার পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তবে উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপে তার চাকরি রক্ষা পায়। বর্তমানে তাকে বনফুলের সিলেট কারখানায় বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকার জরিমানার অর্থ তার বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে বলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছে।

ভুক্তভোগী কর্মচারীর অভিযোগ, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার সুহেল বড়ুয়াকে পূর্বনির্ধারিত বা ‘শেখানো’ বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস.টি.এম. ফখর উদ্দিন বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার কাছে গিয়েছিলেন। এমপি মহোদয় উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনেছেন। তবে ঘটনার বিস্তারিত জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করাই সমীচীন হবে।

এ বিষয়ে বনফুল তাজপুর শাখার ব্যবস্থাপক সুহেল বড়ুয়া বলেন, আমাদের কর্মচারী বয়স্ক এবং নিরক্ষর হওয়ায় ক্রেতার বেশে ইউএনও এসেছিলেন এ বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেননি। এ কারণে ইউএনও তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে জরিমানা করেন।

বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, আমি বা আমার কোনো স্টাফ হয়ত মিষ্টি কিনতে পারে। ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমার সহকর্মী। তিনি শুধু ‘আপা’ ডাকার কারণে জরিমানা করতে পারেন না। হয়ত অন্য কোনো অনিয়ম দেখতে পেয়ে জরিমানা করেছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও বিষয়টি টের পেয়ে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন