প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৫ ১৫:১০
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মরচুয়ারিতে (হিমাগার) রেফ্রিজারেটর সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে লাশ রাখা নিয়ে সংকট তৈরী হয়েছে। ফ্রিজারগুলো নষ্ট থাকায় লাশ রাখতে হচ্ছে কফিনে কিংবা ট্রলিতে। এতে ফরেনসিক প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিও।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মর্গে লাশ রাখার ১৯ বক্সের তিনটি ফ্রিজের ১৭টি বক্সই বিকল হয়ে গেছে। বছরের পর বছর জোড়াতালি দিয়ে পার করলেও এখন নিরুপায় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সিলেটে বিভাগের মানুষের ভরসাস্থল হাসপাতালটির এমন অবস্থায় যেমন হিমশিম খেতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে তেমনি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদাপত্র দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে- বরাদ্দ না পাওয়ায় মরচুয়ারী ফ্রিজার দেয়া যাচ্ছে না। বরাদ্দ পেলেই হাসপাতালগুলোর চাহিদা অনুযায়ী মরচুয়ারী ফ্রিজার সরবরাহ করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের দুটি মরচুয়ারী ফ্রিজে ১৬টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা ছিল। কিন্তু বর্তমানে কার্যকরভাবে রাখা যাচ্ছে মাত্র দুটি মরদেহ। এই ফ্রিজগুলোর মধ্যে ১২টি বক্সের ফ্রিজের কার্যক্ষমতা শেষ হয়েছে ২০১৮ সালে। আরও ৪ বক্সের ফ্রিজটির কার্যক্রমতা শেষ হয়েছে ২০২১ সালে। এরপর থেকেই মেরামত করে চলছিল হাসপাতালে মরদেহ সংরক্ষণের কাজ। কিন্তু বর্তমানে মরদেহ সংরক্ষণের সক্ষমতা না থাকায় নতুন মরদেহগুলো কখন ট্রলিতে রাখা হচ্ছে। এতে পচন ও দুর্গন্ধ ছড়ানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই অবস্থায় ময়নাতদন্ত বা ফরেনসিক পরীক্ষায় যেমন বাধা তৈরি হচ্ছে, তেমনি জনস্বাস্থ্যের দিক থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে দায়িত্বরত নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, ফ্রিজগুলোর কম্প্রেসার গ্যাসসহ নানা সমস্যা হয়েছে। মেকানিক দিয়ে সচল করলেও ক'দিন পরপর নষ্ট হয়ে যায়। মাঝে মাঝে লাশ ট্রলির উপরে আমরা রাখতে হয়।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা.শামসুল ইসলাম বলেন, বছরখানেক ধরে আমাদের মেডিকেল কলেজের একমাত্র ফ্রিজটা নষ্ট হয়ে আছে। সংশ্লিষ্টদের বার বার স্মরণ করে দেয়া হলেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে যে মরদেহগুলো রাখা হয় সেগুলো পুলিশের সুরতহালকৃত। মরচুয়ারী ফ্রিজ প্রত্যেকটি থানায় থাকা জরুরী। এতে করে আইনী কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
এব্যাপারে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা.সৌমিত্র চক্রবর্তী বলেন, ২০০৮ সালে ও ২০১৭ সালে হাসপাতাল মর্গে দুটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ফ্রিজ আনা হয়। ২০০৮ সালের ফ্রিজটির ১২টি চেম্বারের কার্যক্ষমতা ১০ বছর থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতি মেরামত করে চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৭ সালের ৪টি চেম্বারের ফ্রিজটি কার্যক্ষমতা ছিলো ৩ বছর। কিন্তু এখন আর সেটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখন দুটি ফ্রিজের মধ্যে একটি ফ্রিজের দুইটা চেম্বার সচল রয়েছে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চলতি বছরের ২২মে ১২ চেম্বারের নতুন একটি ফ্রিজ চেয়ে চিঠি দিয়েছি। আশা করছি আমরা ফ্রিজটি পাবো। তবে যদি সংশ্লিষ্টরা আমাদেরকে ফ্রিজটি সরবারাহ না করেন তাহলে আমরা নতুন অর্থ বছরের বাজেট থেকে এরকম একটি ফ্রি কেনার চিন্তা ভাবনা করছি। যাতে করে আমরা এই ক্রাইসিস থেকে বের হতে পারি।
তিনি আরও বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট থানা ও মৃত ব্যক্তির আত্মীয় স্বজনকে লাশ রাখার বিকল্প ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করছি। খোলা জায়গায় লাশ রেখে বিকৃত হয়ে যাক এটা আমরা চাই না।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট) ডা.জয়নাল আবেদীন টিটো বলেন, গত ৩ বছরে আমরা হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট থেকে ৩৩টি মরচুয়ারী ফ্রিজার সরবরাহ করেছি। সম্প্রতি বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে আমাদের কাছে মরচুয়ারী ফ্রিজার চেয়েছে। কিন্তু আমরা এ বছর কোনো অর্থ বরাদ্দ পাইনি। যদি অর্থ বরাদ্দ পাই, তাহলে হাসপাতালগুলোর চাহিদা অনুযায়ী মরচুয়ারী ফ্রিজার সরবরাহ করতে পারবো। আর যদি অর্থ বরাদ্দ না-পাই, তাহলে সরকার যেন সরাসরি হাসপাতালগুলোকে অর্থ বরাদ্দ দেয় অথবা সিএমএসডি (সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোরস ডিপো)'র মাধ্যমে ফ্রিজার কিনে দেয়, সেই অনুরোধ করবো।
বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন