বিশেষ প্রতিবেদন

সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন

বিলীনের পথে কুলাউড়ার মনিপুরী তাঁত শিল্প

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮:০৪

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী তাঁত শিল্প অনেকটা বিলীনের পথে। একসময় এই মনিপুরী তাঁত শিল্প বুনতে পাড়া মহল্লায় ব্যস্ত সময় পার করতেন শৈল্পিক কারিগররা। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ এই শিল্প অনেকটা হারিয়ে যাচ্ছে। আগের মতো তাঁত মেশিনের খটখট আওয়াজ এখন আর তেন শুনা যায় না। মনিপুরী তাঁতগুলো তৈরি করে তাদের লোকজন গ্রামীন হাট বাজারগুলোতে বিক্রির জন্য আগে দেখা গেলেও বর্তমানে তাদের পদচারন নেই বললেই চলে। মনিপুরীদের আনাগোনা একেবারে কমে গেছে। শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না, মাছ ধরার জাল ও বিছানার চাদর এসব এখন আর আগের মতো তেমন তৈরি হয় না। দূর দুরান্তের পাইকারদের পদচারনা আর নেই বললেই চলে। বেশিরভাগ মনিপুরীরা তাঁত পল্লীর কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছেন।   

কুলাউড়া উপজেলার সর্ববৃহৎ কর্মধা ইউনিয়নের ফটিগুলি, ভান্ডারীগাঁও ও নলডরী এবং পাশ্ববর্তী জুড়ী উপজেলার পূর্বজুড়ী ইউনিয়নের ছোট ধামাই এলাকায় বসবাস করছেন মনিপুরী সম্প্রদায়ের প্রায় ২ সহস্রাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু। আড়াই যুগ আগেও এসব এলাকায় ৫ শতাধিক তাঁত পল্লী চালু ছিলো। অধিকাংশ মনিপুরী নারী-পুরুষ তাঁত পল্লীতে কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এসময় কাঠের তাঁতের মেশিনের খটখট আওয়াজ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়তো। তৈরি হতো শত শত শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না, মাছ ধরার জাল ও বিছানার চাদর। এসব তৈরি মনিপুরী পোশাকসহ অন্যান্য সামগ্রী দেশ ছেড়ে বিদেশেও চলে যেতো। দেশের নামকরা বিভিন্ন বায়িং হাউজ মনিপুরী শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না ও বিছানার চাদর ক্রয় করতে ছুটে আসতেন এসব মনিপুরী পাড়ায়। কিন্তু এসব চিত্র এখন আর দেখা যায় না। সময়ের বিবর্তনে তা হারিয়ে যাচ্ছে। জুড়ী উপজেলার ছোট ধামাই এলাকার নিলয় সিং, তপন কুমার সিং, রঞ্জিতা দেবী, সুমি দেবী, শান্তা দেবী এবং কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের ভান্ডারী গ্রামের মনিপুরী স্কুল শিক্ষিকা পুষ্পিতা, শিউলী দেবী, ব্যবসায়ী রাজেস সিং বলেন, বর্তমানে নিজেদের ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী মেয়েদের পোশাক ওড়না ও গামছা তৈরি করছি। সনাতনী পদ্ধতিতে রংঙ্গীন  ১টি শাড়ি তৈরি করতে ২দিন সময় লাগে। ১ কেজি সুতায় ৩টি শাড়ি তৈরি করা যায়। ১টি তাঁতের মেশিনে ৭-৮টি শাড়ি তৈরি করার জন্য একসাথে সুতা প্রসেসিং করা যায়। ৮টি শাড়ির সুতা প্রসেসিং করতে ৪-৫দিন সময় লেগে যায়। ১টি শাড়ি মজুরিসহ তৈরি করতে প্রায় ১৩০০ টাকা খরচ হয়।কিন্তু ক্রেতাদের সাথে অনেক দেনদারের পরে একটি শাড়ী বিক্রি হয় ১৫ শত থেকে ২ হাজার টাকা। সুতার দাম এখন অনেক আকাশচুম্বি। যার ফলে এসব পোশাক বিক্রি করে লাভ পোষানো যায় না। নিজেদের পরিশ্রম, ইলেকট্রিক বিল, সুতা রং করাসহ অনেক খরচ পড়ে যায়। শুধু শাড়ি নয় সবকিছু তৈরি করতে অনেক টাকা ব্যয় হয়। সে তুলনায় লাভ হয় নাম মাত্র। এসব কারনে মনিপুরী শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না, মাছ ধরার জাল ও বিছানার চাদর তৈরি অনেক জায়গায় প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। আমাদের সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন সরকারি-বেসরকারি চাকুরি, কৃষি ও অন্যান্য কাজে ঝুঁকে পড়েছে। যার কারনে বিভিন্ন জায়গায় মনিপুরী তাঁত শিল্প এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। ভান্ডারীগাঁও গ্রামের সরকারি চাকুরিজীবী প্রদীপ সিং বলেন, তাদের মনিপুরী তাঁত শিল্প এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। আড়াই যুগ আগেও মনিপুরী পোশাকের খুব চাহিদা ছিলো। মনিপুরী তাঁত আমাদের ঐতিহ্য। যুগের পর যুগ আমাদের পূর্ব পুরুষরা এই শিল্পে জড়িত ছিলেন। মনিপুরী তাঁতের কাপড় বুনে আমাদের বাপ, দাদা, চাচা ও মামাদের সংসার চলতো। এখন এই পেশা ছেড়ে আমরা অন্য পেশায় নিয়োজিত রয়েছি। ফটিগুলি গ্রামের জিহারি সিংহ, নলডরী গ্রামের দিলীপ কুমার সিংহ, ভান্ডারীগাঁও গ্রামের সুরঞ্জিত সিংহ ও গৌর চন্দ্র সিংহ জানান, কুলাউড়ার মনিপুরী তাঁত শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো সময় আছে সরকার ও উদ্যোক্তারা যদি এগিয়ে আসে তাহলে ঐতিহ্যবাহী মনিপুরীদের এই শিল্প আবারো আলোর মুখ দেখবে।

মোঃ নাজমুল ইসলাম 
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) 
মোবাইল- ০১৭১৩-৮০৫৭১৯

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন


 শিরোনাম
news icon সরকার সিলেটে সবজি উৎপাদন ও রপ্তানির বড় কেন্দ্র করতে চায় সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী news icon জগন্নাথপুরে জমিতে পানি সেচ ও মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত ১ news icon ফায়ার সার্ভিসকে একটি বিশ্বমানের  প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে : বাণিজ্যমন্ত্রী news icon জকিগঞ্জে ছেলের হাতে মা খুন, আহত পরিবারের ৪ সদস্য news icon কোম্পানীগঞ্জে পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে ‘প্রতিপক্ষের হামলায়’ যুবক নিহত news icon বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারে গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর news icon পলাতক হাসিনার ফেরার গুঞ্জনে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী news icon শ্রীমঙ্গলে নিখোঁজ মাদ্রাসা শিক্ষককে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার, হাসপাতালে মৃত্যু news icon সিলেটে ২৪ ঘন্টার অভিযানে ৫৭ জন গ্রেফতার, ১০৫টি মামলা news icon শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে এবার মিলল ৮৮ লাখ টাকা