প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:২৩
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ কর্মসূচি, নির্বাচন কমিশনের ভেতরে মতবিরোধ এবং বিরোধী দলগুলোর ‘ভোট চুরি’র অভিযোগের কারণে দেশটির নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিজেপি নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ করেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মতবিরোধের খবর। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা, নতুন ভোটার নিবন্ধনের নিয়ম এবং তালিকা নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। একটি ঘটনায় তারা এ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে চিঠিও লিখেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেন। তবে সান্ধু ও জোশি প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। নির্বাচন কমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ভিন্নমত ও আলোচনা থাকা স্বাভাবিক।
ভোটার তালিকা সংশোধন কেন বিতর্কিত
এই মতবিরোধের খবর সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচি চলছে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, অযোগ্য এবং একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে তালিকা হালনাগাদ করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য। কমিশনের দাবি, প্রায় ২৫ বছর আগে সর্বশেষ এ ধরনের সংশোধন হয়েছিল। তাই পুরোনো তথ্য যাচাই করে তালিকা নতুন করে সাজানো প্রয়োজন।
কিন্তু এই প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন। তাদের অভিযোগ, ভোটারদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য পুরোনো জন্ম, জমি বা শিক্ষাসংক্রান্ত নথি চাওয়া হচ্ছে। দরিদ্র, অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছে এসব নথি নেই। আবার পুরোনো নথিতে নামের বানান বা অন্যান্য তথ্যের সামান্য অমিল থাকলেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ে যাচ্ছে। সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এরই মধ্যে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ নাম বাদ পড়েছে বলে জানানো হয়েছে। বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে মুসলমানদের অনুপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে এমন ঘটনার মধ্যেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। মমতা ব্যানার্জী এ জন্য সরসারি মোদী সরকারকে দায়ী করেছেন।
বিজেপি ও এসআইআরের সমর্থকদের বক্তব্য, এই কর্মসূচির মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসী, মৃত ব্যক্তি ও ভুয়া ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় বাদ পড়া মুসলমানদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় ভারতীয় নাগরিকদের নামও বাদ পড়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে যাচাইয়ের নিয়ম, নথির গ্রহণযোগ্যতা এবং আপিলের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশি এসআইআর কর্মসূচির সমালোচনা করেছেন। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি বলেন, এত দিন সান্ধু ও জোশি কেন নীরব ছিলেন, তা নিয়ে তার প্রশ্ন ছিল। তবে তাদের আপত্তি নথিভুক্ত করার খবর জানার পর দুই কমিশনারের প্রতি তার শ্রদ্ধা বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আরও জোরালো প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরেই কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট ‘চুরির’ অভিযোগ করে আসছেন। বুধবার তিনি নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগ তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তার দাবি, ভোট চুরি জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং সংবিধানের ওপর আঘাত। তিনি বিজেপি, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেন।
রাহুলের আরও দাবি, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনসহ বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কারচুপির বিষয়ে তার কাছে যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। তিনি হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও উত্তর প্রদেশের মতো রাজ্যে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের প্রভাব নির্বাচনে কেন দেখা যায়নি, সে প্রশ্নও তুলেছেন। দুই কমিশনারের আপত্তি নথিভুক্ত করাকে তিনি ‘বুদ্ধিমানের কাজ’ বলে উল্লেখ করেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানান।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জীও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। তার দাবি, এসআইআরের আগের ভোটার তালিকা ব্যবহার করে রাজ্যে নতুন করে নির্বাচন আয়োজন করা উচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে সংশোধন প্রক্রিয়ায় অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। মমতা ও তার সমর্থকদের অভিযোগ, এতে রাজ্যের কয়েকটি আসনে তাদের ক্ষতি হয়েছে এবং নির্বাচনের ফল প্রভাবিত হয়েছে।
দিল্লিতে বিক্ষোভ, আটক কয়েকজন
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে শুক্রবার দিল্লির যন্তর মন্তরে বিভিন্ন সংগঠনের কর্মী-সমর্থকেরা বিক্ষোভ করেন। এর আগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি তরুণদের সংগঠন কুমারকে পদত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
বিক্ষোভে অংশ নেন সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী নেহা বোরাসহ কয়েকজন অধিকারকর্মী। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও অধিকারকর্মী যোগেন্দ্র যাদবও কর্মসূচিতে যোগ দেন।
যন্তর মন্তরের আশপাশে ব্যারিকেড বসিয়ে বিক্ষোভকারীদের নির্ধারিত স্থানে প্রবেশে বাধা দেয় দিল্লি পুলিশ। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন কর্মীকে আটক করা হয়। নেহা বোরাস বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন চলবে। দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এসআইআর কর্মসূচি বাতিল এবং কয়েকটি রাজ্যে নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানান।
নথি ও যাচাইয়ের নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন
ওয়াশিংটনভিত্তিক কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক মিলান বৈষ্ণবের মতে, এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধনের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আসছে। তার বক্তব্য, আগে নাগরিকদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধন নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ছিল; এখন ভোটারদেরই তালিকায় থাকার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হচ্ছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কুরেশিও কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কমিশনারদের মধ্যে আলোচনা ও মতপার্থক্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অংশ। বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্রও কমিশনের ভেতরে মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠনের সমালোচনা থামেনি।
আস্থার সংকটের আশঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলির মতে, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্বে থাকা স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, ভোট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। মিলান বৈষ্ণবের বিশ্লেষণ, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
এসআইআর নিয়ে বিতর্ক এখন আর শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়মে সীমাবদ্ধ নেই। ভোটারদের অধিকার, নথি যাচাইয়ের স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা সবই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত ও বিরোধীদের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক চলার পাশাপাশি, সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে কি না এবং তাদের জন্য কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থা আছে কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বিবিসি, আল-জাজিরা
সারাবিশ্ব থেকে আরো পড়ুন