রাজনীতি

১০ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক, সিদ্ধান্ত ব্যক্তিনির্ভর: টিআইবি

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ১৬:৫২

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ ১০টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক। অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণও ব্যক্তিনির্ভর। সিপিবি ছাড়া অন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে এক ব্যক্তি কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন, তার উল্লেখ নেই। নেতৃত্ব বাছাইয়ে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার চেয়ে পরিবার, অর্থ ও তারকাখ্যাতি প্রাধান্য পাচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওছার আহমেদ ও কাজী আমিনুল হাসান।


টিআইবি জানায়, এ গবেষণায় ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৩২টির তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের কার্যক্রম পর্যালোচনায় ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব থাকা অন্য দলগুলো হলো জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।

প্রতিবেদন বলছে, ১২টি দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪১ বছর নেতৃত্বে আছেন আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদের উল্লেখ নেই। স্থানীয় কমিটিতেও একই ব্যক্তির দীর্ঘদিন নেতৃত্বের চর্চা রয়েছে।


প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ব্যক্তিনির্ভর। ১৬টি দলের কাউন্সিল অনিয়মিত; সেখানে সাধারণত পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। নীতি ও কৌশল নির্ধারণে তৃণমূলের মত দেওয়ার সুযোগ সীমিত। অধিকাংশ দলে গোপন ব্যালটের বদলে কণ্ঠভোটে প্রধান নির্বাচিত হন। শুধু বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিতে শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেখা গেছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ, গোপন ভোটের অনুপস্থিতি এক ব্যক্তির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বাড়িয়ে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ কমায়।

পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রার্থী মনোনয়নে স্থানীয় কমিটির প্রস্তাবিত প্যানেল বিবেচনার বিধান অধিকাংশ দল মানে না; দলীয় প্রধানের মতামতই প্রাধান্য পায়। বড় দলগুলোয় অর্থ ও পেশিশক্তিকে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রভাবশালী তিনটি দল বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিতে মনোনয়ন–বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

আইন মানা ও নারীর অংশগ্রহণে ঘাটতি
টিআইবির মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির গঠনতন্ত্রে বিদেশে সংগঠন পরিচালনার উল্লেখ রয়েছে; আরও অন্তত ছয়টি দল বিদেশে শাখা বা কার্যক্রম চালায়। মাত্র দুটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্য ৩৩ শতাংশ বা এর বেশি। জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী নেই।

জবাবদিহি ও আর্থিক হিসাবে ঘাটতি
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কোনো দলেই নেতা–কর্মীদের স্বতন্ত্র আচরণবিধি নেই। তাঁদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী নাগরিকের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও অনুপস্থিত। শৃঙ্খলাভঙ্গের শাস্তি, তদন্ত ও আপিলপ্রক্রিয়া অস্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধে সম্পৃক্ত নেতা–কর্মীদের শাস্তির বদলে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

কোনো দলের আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালি বিধি নেই; বার্ষিক বাজেটও করা হয় না। অধিকাংশ দল অর্থের বিনিময়ে নামমাত্র নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

দুর্বৃত্তায়ন ও আইনের সীমাবদ্ধতা
গবেষণার তথ্য বলছে, ১৮টি দলের গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার শর্ত নেই; অপরাধীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসা ঠেকানোর ব্যবস্থাও নেই। নতুন দলের নিবন্ধনের শর্ত পূরণে ৩৩ থেকে ৭৬ লাখ টাকা প্রয়োজন। এতে বিত্তবানদের ওপর নির্ভরতা ও স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। নিবন্ধনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও নিয়মবহির্ভূত লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

টিআইবির সুপারিশের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সহজ করা, গোপন ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন, নেতৃত্বের মেয়াদসীমা নির্ধারণ, তৃণমূলের ভোটে প্রার্থী প্যানেল তৈরি ও মনোনয়নে তিন বছরের সদস্যপদ বাধ্যতামূলক করা। পাশাপাশি আর্থিক হিসাব প্রকাশ ও যাচাই, নির্দিষ্ট সীমার বেশি লেনদেন ব্যাংকে করা, দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনে আনা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি এবং অপরাধীদের অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে অপরাধে জড়িত নেতা–কর্মীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন


বিজ্ঞাপন

 শিরোনাম
news icon মাধবপুরে সোনাই নদীতে ডুবে শিশুর মৃত্যু, সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর উদ্ধার মরদেহ news icon পরাজিত শক্তি দেশকে অস্থিতিশীল করতে উস্কানি দিচ্ছে: সিলেটে রিজভী news icon চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে খুনের ৩ আসামি news icon বাহুবলে পিকআপ-কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ news icon গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ অব্যাহত, ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন news icon পোশাক খাতে অস্থিরতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে সরকার news icon ১১ বছর পর সাবেক মেয়র কামরানের ওপর বোমা হামলা মামলা থেকে খালাস পেলেন ৭০ নেতা-কর্মী news icon জুড়ীতে গোবর থেকে গ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন news icon সুনামগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলা, নিষিদ্ধ দলের নেতাসহ গ্রেপ্তার ৮ news icon সিলেটে হামে ১ শিশুর মৃত্যু, নতুন ভর্তি ১২৬